সচিবালয়ে তদবিরের ‘মহোৎসব’: শৃঙ্খলার বাইরে শত শত মানুষ, ব্যাহত হচ্ছে দাপ্তরিক কাজ

Spread the love

নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকাঃ

দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে এখন দাপ্তরিক ফাইলের চেয়ে তদবিরের স্তূপই যেন বেশি ভারী হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বদলি ও পদায়নের আবেদন নিয়ে আসা মানুষের চাপে নাভিশ্বাস উঠছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের। প্রতিদিন নির্ধারিত পাসের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি মানুষ অবৈধভাবে বা প্রভাব খাটিয়ে প্রবেশ করায় ভেঙে পড়েছে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা। অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশ (ডিও লেটার) হাতে নিয়ে এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে দৌড়ঝাঁপ করছেন বিসিএস ক্যাডারভুক্ত অধ্যাপক থেকে শুরু করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও।

সচিবালয় সূত্রমতে, মন্ত্রী বা সচিবের পক্ষ থেকে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০টি প্রবেশ পাস অনুমোদনের নিয়ম থাকলেও বাস্তবে তা মানা হচ্ছে না। হাজার হাজার তদবিরকারী কোন প্রক্রিয়ায় ভেতরে ঢুকছেন, তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। মঙ্গলবার সরেজমিন দেখা যায়, শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বারান্দা ও কর্মকর্তাদের কক্ষের সামনে মানুষের গিজগিজ ভিড়। এতে স্বাভাবিক নীতিনির্ধারণী কাজগুলো মারাত্মকভাবে পিছিয়ে যাচ্ছে।

তদবিরকারীদের তালিকায় রয়েছেন প্রভাবশালী শিক্ষা ক্যাডার কর্মকর্তারাও। কয়েকজনের দৌড়ঝাঁপ ছিল চোখে পড়ার মতো:

অধ্যাপক সৈয়দ মো. শরিফ ইস্পাহানী: সরকারি সা’দত কলেজের এই শিক্ষক অধ্যক্ষ পদে নিয়োগ পেতে একজন প্রতিমন্ত্রীর সুপারিশ নিয়ে মন্ত্রীর পিএসের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন।

সৈয়দ কামরুল হোসেন: মাউশির এই বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা পছন্দের কলেজে বদলির জন্য মরিয়া।

ড. মো. আব্দুর রউফ: নওগাঁ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদের জন্য এমপির ডিও লেটার নিয়ে মন্ত্রণালয়ে দিনভর ছোটাছুটি করছেন।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত আমাদের রুমের বাইরে মানুষের মেলা বসে। খাওয়া-দাওয়া এমনকি ব্যক্তিগত কাজ করার সময়টুকুও পাওয়া যাচ্ছে না।”

তদবিরের এই ভয়াবহ চাপে খোদ শিক্ষামন্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছেন তার একান্ত সচিব প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল। এমনকি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও সম্প্রতি তদবিরের সংস্কৃতি নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত শুধু পোস্টিংয়ের আবদার আসতে থাকে।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) অধ্যাপক বিএম আব্দুল হান্নান জানান, আগে প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপকদের বদলি মাউশির অধীনে ছিল। কিন্তু গত বছর এই ক্ষমতা মন্ত্রণালয়ে নেওয়ায় এখন সব চাপ সেখানে গিয়ে পড়ছে।

শিক্ষা বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ বলেন, “বদলি ও পদায়নে স্বচ্ছতা না থাকলে এই অস্থিরতা কমবে না। এতে দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।” একই সঙ্গে অনেক আবেদনকারীর বিরুদ্ধে আর্থিক লেনদেনের গোপন অভিযোগও উঠেছে।

সচিব আবদুল খালেক জানান, মানুষকে নিষেধ করা সত্ত্বেও তারা আসছেন, ফলে নিয়মিত প্রশাসনিক কাজ শেষ করতে দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ব্যক্তিগত যোগাযোগ বা ডিও লেটার ভিত্তিক বদলি প্রথা বন্ধ করে একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল নীতিমালাভিত্তিক বদলি ব্যবস্থা চালু করা এখন সময়ের দাবি। এটি নিশ্চিত করা গেলে সচিবালয়ে মানুষের চাপ কমবে এবং শিক্ষা খাতে শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top