দ্বিগুণ দামে বস্তা, অর্ধেক দামে আলু: দিশেহারা দুর্গাপুরের আলুচাষিরা
ফরিদ আহমেদ আবির, নিজস্ব প্রতিনিধিঃ গত মৌসুমের লোকসানের ক্ষত এখনো শুকোয়নি। ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্নে বুক বেঁধে চলতি মৌসুমে আবারও আলু চাষ করেছিলেন রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কৃষকেরা। ফলনও হয়েছে আশানুরূপ। কিন্তু মাঠ থেকে আলু তোলার এই মাহেন্দ্রক্ষণেই কৃষকদের সামনে নতুন বিষাদ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘বস্তা সংকট’ ও ‘বাজারের দরপতন’। একদিকে আকাশচুম্বী দাম দিয়েও মিলছে না পাটের বস্তা, অন্যদিকে পানির দরে বিক্রি করতে হচ্ছে কষ্টের ফসল।

উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, এবার চাষাবাদকৃত জমি১,৫৪৫ হেক্টরআলু উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা৪৩,২৬০ মেট্রিক টনআবাদকৃত জাতডায়মন্ড (৮২০ হেঃ), কার্ডিনাল (৫৪০ হেঃ), এস্টোরিক্স (১৬০ হেঃ)প্রতি কেজি উৎপাদন খরচপ্রায় ১৩-১৪ টাকাবর্তমান বাজার মূল্য (কেজি প্রতি)১২-১৩ টাকা।
চাষিদের অভিযোগ, বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে আলুর দাম কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও আলুর দাম ছিল ১৫-১৬ টাকা কেজি, যা বর্তমানে ১২ টাকায় নেমে এসেছে। কৃষকদের অভিযোগের তীর তথাকথিত ‘বস্তা সিন্ডিকেটের’ দিকে।
গত বছর যে পাটের বস্তা ৭০-৮০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, বর্তমানে তা ১৮০-১৯০ টাকায় ঠেকেছে। টাকা দিলেও মিলছে না বস্তা। ৮-১০ দিন আগে অর্ডার দিয়েও কৃষকেরা বস্তা হাতে পাচ্ছেন না।
স্থানীয়ভাবে বস্তা না পেয়ে অনেক কৃষক নওগাঁ, বগুড়া এমনকি ঢাকা-গাজীপুরে গিয়েও খালি হাতে ফিরছেন।
বখতিয়ারপুর গ্রামের চাষি সোহরাব হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “বস্তা সংকটের দোহাই দিয়ে হিমাগার মালিক, মজুদদার ও জুট মিলের সিন্ডিকেট আমাদের পথে বসাচ্ছে। একদিকে উৎপাদন খরচের চেয়ে কম দামে আলু বিক্রি করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বস্তার দাম দ্বিগুণ।
উপজেলার আলু চাষি রশিদ আলী আক্ষেপ করে জানান, দ্বিগুণ দাম দিয়েও বস্তা পাওয়া যাচ্ছে না, ফলে আলু সংরক্ষণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী জানান, এবার আলুর ফলন চমৎকার হয়েছে। তবে বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না থাকায় কৃষকেরা চিন্তিত। আলু সংরক্ষণ করতে পারলে তারা লাভবান হতেন, কিন্তু বস্তা সংকটের বিষয়টি আমরাও শুনতে পাচ্ছি।
অন্যদিকে, হিমাগার মালিকদের দাবি—জ্বালানি সংকট ও চাহিদার তুলনায় পাটের বস্তার উৎপাদন কম হওয়ার কারণেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এখানে কোনো সিন্ডিকেটের হাত নেই বলে তারা দাবি করেন।
দুর্গাপুরের আলুচাষিরা এখন উভয়সংকটে। হিমাগার ভাড়া, পরিবহন খরচ ও শ্রমিক মজুরির সাথে বস্তার অতিরিক্ত দাম যোগ করলে আলুর দাম গিয়ে দাঁড়ায় ২০ টাকার উপরে। অথচ বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়। এই অসম লড়াইয়ে কৃষকের স্বপ্ন এখন হিমাগারের অন্ধকারে বিলীন হওয়ার পথে।


