শিরোনাম :
দূর্গাপুরে নতুন শিল্পীদের খোঁজে শুরু হচ্ছে ‘নিয়ামতপুরে ভূমি সেবা সংক্রান্ত গণশুনানি অনুচারঘাট মডেল থানার এএসআইয়ের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তচারঘাটে নারী সহায়তা ফোরামের সঙ্গে উপজেলা প্ররাজশাহীতে র‍্যাব-৫ এর পৃথক অভিযানে ১০টি গাঁজগভীর রাতে র‍্যাবের জালে পুঠিয়ার গাঁজা চাষিশিবগঞ্জ সীমান্তে বিজিবির অভিযানে চোরাই মোবামেধাবী ও রোমাঞ্চকর জীবনসঙ্গী: সাংবাদিকের সাথবেনাপোল বন্দরের জব্দকৃত পণ্য বদলের অভিযোগ, ২.চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভায় বর্জ্য পৃথকীকরণ কার

পর্দার অন্তরালে রাঘববোয়ালরা: তেল চুরির অদৃশ্য সাম্রাজ্য

Spread the love

নিজস্ব প্রতিবেদক

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাবে দেশের জ্বালানি খাতে সংকট তৈরি হলেও এর আড়ালে সক্রিয় হয়ে উঠেছে তেল চোর সিন্ডিকেট। সরকারের অভিযানে বিপুল পরিমাণ তেল উদ্ধার হলেও বারবার আড়ালেই থেকে যাচ্ছে মূল হোতারা। তদন্ত, বদলি ও সাময়িক শাস্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকায় অপরাধ থামছে না।

সংকটের আড়ালে চুরির মহোৎসবঃ মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে দেশের জ্বালানি বাজারে। এই সুযোগে দেশের বিভিন্ন তেল ডিপোতে দীর্ঘদিন ধরে চলা চুরির ঘটনা নতুন করে সামনে এসেছে। সরকারের বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে লাখ লাখ লিটার মজুতকৃত তেল উদ্ধার হওয়ায় বিষয়টি আবার আলোচনায়।

রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন কোম্পানি—পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা অয়েলের ৫৫টি ডিপো থেকে নানা কৌশলে তেল চুরির অভিযোগ বহুদিনের। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এই চক্রের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালী সিবিএ নেতা থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারাও।

চুরি হওয়া তেলকে ‘সিস্টেম লস’ বা ‘ট্রান্সপোর্ট লস’ হিসেবে দেখানোর অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। ফলে কাগজে-কলমে হিসাব ঠিক থাকলেও বাস্তবে তেল গায়েব হয়ে যাচ্ছে।

এভাবে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকার তেল আত্মসাৎ করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পার্বতীপুর ডিপোতে পুনরাবৃত্ত চুরি দিনাজপুরের পার্বতীপুর ডিপোতে ২০২৪ সালের জুনে ৬ হাজার লিটার তেল চুরির ঘটনা ঘটে। তদন্ত কমিটি গঠন হলেও সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

পরবর্তীতে একই ডিপো থেকে আবারও ৪৫ হাজার লিটার তেল উধাও হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, অডিটের সময় ডিলারদের কাছ থেকে পে-অর্ডার নিয়ে কাগজে বিক্রি দেখিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়।

অভিযুক্তরাই বহাল, বদলি হচ্ছেন অন্যরাঃ তেল পাচারের অভিযোগে পূর্বে বরখাস্ত হওয়া একাধিক কর্মকর্তা পুনরায় দায়িত্বে বহাল আছেন। অথচ নিম্নস্তরের কর্মচারীদের বদলি করে দায় সেরে ফেলা হচ্ছে।

এক অপারেটরের অভিযোগ, “কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া অতিরিক্ত তেল দেওয়ার সুযোগ নেই। অথচ আমাদেরই বলির পাঁঠা বানানো হচ্ছে।”

পরিবহণেই বড় কারচুপিঃ তেল পরিবহণের সময় লড়িতে নির্ধারিত পরিমাণের বাইরে অতিরিক্ত তেল বহন করা হয়। প্রতিটি লড়িতে ২০০ থেকে ৫০০ লিটার অতিরিক্ত তেল নেওয়া হয়, যা মাঝপথে বিক্রি করা হয়। এভাবে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল কালোবাজারে চলে যাচ্ছে।

নদীপথেও সক্রিয় চক্র বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে জাহাজ থেকে তেল নামানোর সময় বাল্কহেডে তেল সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা পুরোনো হলেও এখনও চলছে। স্থানীয় প্রভাবশালী চক্র এ কাজে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।

২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল উধাও সম্প্রতি নারায়ণগঞ্জের গোদনাইল থেকে কুর্মিটোলা ডিপোতে যাওয়ার পথে ৭২ হাজার লিটার জেট ফুয়েল উধাও হওয়ার ঘটনা চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।

কাগজে-কলমে তেল পৌঁছালেও বাস্তবে তা গন্তব্যে পৌঁছেনি। সংশ্লিষ্টরা জানান, এই জেট ফুয়েল অকটেনের সঙ্গে মিশিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করা হয়।

খোলা বাজারে চোরাই তেলের বেচাকেনা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশ্যে চোরাই তেল বিক্রি হচ্ছে। রাস্তার পাশে, বাজারে এবং গোপন গুদামে ডিজেল ও অকটেন বিক্রি হচ্ছে অতিরিক্ত দামে।

খুলনায় তিনগুণ দামে বিক্রিঃ খুলনা অঞ্চলে ডিপো থেকে তেল বেরিয়ে গিয়ে গ্রামাঞ্চলে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ১০০ টাকার ডিজেল ১০৫-১১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বলে জানা গেছে।

পাম্প মালিকদের একটি অংশও এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ।

অভিযোগ রয়েছে, তেল চুরির সঙ্গে জড়িত অনেক কর্মকর্তা কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। দেশে-বিদেশে গড়ে তুলেছেন বিপুল সম্পদ। তদন্ত কমিটি গঠন হলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দৃশ্যমান শাস্তি হয় না। ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।

জ্বালানি খাতের এই দুর্নীতি শুধু অর্থনৈতিক নয়, জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও হুমকি। যতদিন পর্যন্ত রাঘববোয়ালরা ধরা না পড়বে, ততদিন এই চক্র ভাঙা সম্ভব নয়।

সময় এসেছে—চোর নয়, চক্রের মূল হোতাদের বিচারের আওতায় আনার।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top