ওমর আলী, মহানগর প্রতিনিধি,রাজশাহীঃ আকাশে ওড়ার স্বপ্ন দেখিয়ে প্রতারণার জাল বিছিয়েছিলেন মাটিতে। নিজেকে আন্তর্জাতিক মানের পাইলট কিংবা বিদেশি এভিয়েশন ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে পরিচয় দিয়ে একের পর এক নারীর সঙ্গে প্রেম ও বিয়ের সম্পর্ক গড়ে তুলতেন। অবশেষে রাজশাহীর এই কুখ্যাত ‘সিরিয়াল’ প্রতারক মারুফ ওরফে অধি পুলিশের জালে ধরা পড়েছেন। তার বিরুদ্ধে উঠে এসেছে অর্থ আত্মসাৎ, একাধিক বিয়ে এবং পাশবিক নির্যাতনের ভয়াবহ সব চিত্র।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নগরীর উত্তরা ক্লিনিক মোড় এলাকার বাসিন্দা অধি তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে ব্যবহার করতেন শিকার ধরার ফাঁদ হিসেবে। বিদেশের মাটিতে তোলা ছবি, ককপিটে বসা কিংবা বিমান সংক্রান্ত নানা ভুয়া পোস্ট দিয়ে নিজেকে একজন সফল উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে জাহির করতেন। তার পোশাক-আশাক এবং চলন-বলন দেখে সাধারণ মানুষের পক্ষে তার আসল পরিচয় বোঝা ছিল দুষ্কর। মূলত এই ডিজিটাল ইমেজ ব্যবহার করেই তিনি নারীদের বিশ্বাস অর্জন করতেন।
অধির প্রতারণার শিকার প্রথম স্ত্রীর বয়ানে উঠে এসেছে নির্যাতনের বীভৎস বর্ণনা। তিনি জানান:
- আর্থিক শোষণ: বিয়ের পর থেকেই ট্রেনিং ফি, বিদেশে যাওয়ার খরচ কিংবা ব্যবসার অজুহাতে দফায় দফায় মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিতেন অধি।
- শারীরিক ও মানসিক নিগ্রহ: টাকা দিতে অস্বীকার করলে বা দেরি হলে চলত অমানুষিক নির্যাতন এবং গালিগালাজ।
- গোপন বিয়ে: প্রথম স্ত্রীকে তালাক না দিয়েই তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করেন অধি। পরে জানাজানি হলে প্রথম স্ত্রীকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়।
আরেক ভুক্তভোগী (সাবেক প্রেমিকা) জানান, তাকে বিদেশে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে দীর্ঘদিনের সম্পর্কে জড়ান অধি। পরে তিনি জানতে পারেন, অধির পেশা এবং পারিবারিক অবস্থা—সবই ছিল মিথ্যা।
গত ২৬ ফেব্রুয়ারি গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রাজশাহীর ভদ্রা আবাসিক এলাকার ‘নিসুস মেকওভার’ নামক একটি বিউটি পারলার থেকে মান্দা থানা পুলিশ তাকে আটক করে। এই অভিযানে চন্দ্রিমা থানা পুলিশ সহযোগিতা করে। মামলায় অধির বাবা-মাকেও আসামি করা হয়েছে এবং পলাতক আসামিদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এটি একটি সুপরিকল্পিত প্রতারণা চক্র। তিনি মূলত নারীদের আবেগকে পুঁজি করে অর্থ উপার্জনকে পেশা হিসেবে নিয়েছিলেন। আরও ভুক্তভোগী যোগাযোগ করলে মামলার পরিধি আরও বাড়তে পারে।
এই ঘটনাটি রাজশাহীতে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারো চাকচিক্যময় জীবন দেখে বিমোহিত হওয়া ঠিক নয়। বিয়ে বা বড় কোনো আর্থিক লেনদেনের আগে অবশ্যই পেশাগত পরিচয় এবং পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড যাচাই করা জরুরি।
