নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব)-এর প্রধান কার্যালয়ের আইসিটি সিস্টেম বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ, নারী কেলেঙ্কারি এবং সহকর্মীদের সঙ্গে অসদাচরণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রাজশাহী কার্যালয় থেকে রাকাব কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অভিযোগগুলো তদন্ত করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মতামত জানাতে বলা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, অভিযোগের বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে বিস্তারিত প্রতিবেদন দাখিল করতে হবে।

এর আগে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি রাকাবের কর্মী মো. জহির বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে একটি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগপত্রে আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, আইসিটি বিভাগে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন প্রযুক্তি–সংক্রান্ত বিল পাস করাতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের কমিশন আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করার অভিযোগ ওঠায় অতীতে তাকে শাস্তিমূলকভাবে রংপুরে বদলি করা হয়েছিল বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
এ ছাড়া দায়িত্বে অবহেলা ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ভ্রমণে না গিয়েও ভুয়া ভ্রমণ বিল তৈরি করে ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন তিনি।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে একাধিক নারীঘটিত কেলেঙ্কারির অভিযোগ রয়েছে। রংপুরে কর্মরত থাকাকালে তিনি অসামাজিক কর্মকাণ্ডে জড়িত অবস্থায় ধরা পড়েন এবং দুই লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরে ২০২৫ সালের আগস্টে কালিয়াডাঙ্গা এলাকায় আবারও একই ধরনের ঘটনায় ধরা পড়ে এক লাখ টাকার বিনিময়ে রফাদফা করেন বলে দাবি করা হয়।
এছাড়া কর্মস্থলে নারী সহকর্মীদের সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন এবং তাদের বিশেষ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, আরিফুজ্জামান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়াহিদা বেগমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর) পরিবর্তন করে ৪০ লাখ টাকার বিনিময়ে অবৈধ পদোন্নতির ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়, গত ৫ আগস্ট ছাত্র–জনতার গণআন্দোলনের সময় শহীদ আবু সাঈদ ও মুগ্ধর ছবিসংবলিত একটি ব্যানার ছিঁড়ে ফেলার ঘটনাতেও তিনি জড়িত ছিলেন। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল ও ব্যাংকের কর্মীদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আইসিটি সিস্টেম বিভাগের উপ-মহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আরিফুজ্জামান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, “এই বিষয়ে আমি কোনো বক্তব্য দেব না। আপনারা নিজেরা তদন্ত করে দেখেন। যারা এ বিভাগ থেকে আর্থিকভাবে লাভবান হতে পারেনি, তারাই এসব অভিযোগ তুলেছে।”
অন্যদিকে রাকাবের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম মোরতজা বলেন, “আরিফুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশেই এ তদন্ত শুরু হয়েছে। আমি এখানে নতুন দায়িত্ব নিয়েছি, তাই কিছুটা সময় লেগেছে। তবে দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। তদন্তের স্বার্থে তাকে ইতিমধ্যে বদলি করা হয়েছে।”
ব্যাংক খাতের বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সুনাম নয়, পুরো আর্থিক খাতের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তারা বলছেন, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দোষ প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তি নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যতে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রবণতা আরও বাড়তে পারে।
