বাঙালি চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের জন্মদিন আজ। ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের বাংলা প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত পাবনা জেলার সেন ভাঙাবাড়ি গ্রামে (বর্তমানে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলা) জন্মগ্রহণ করেন তিনি। সময়ের পরিক্রমায় তিনি হয়ে ওঠেন বাংলা চলচ্চিত্রের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার অভিনয়, ব্যক্তিত্ব ও রহস্যময় উপস্থিতি আজও দর্শকের হৃদয়ে অম্লান।

এই বিশেষ দিনে মাকে স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়েছেন তার কন্যা, বর্ষীয়ান অভিনেত্রী মুনমুন সেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি মায়ের সঙ্গে কাটানো জীবনের নানা অজানা স্মৃতি ও অনুভূতির কথা শেয়ার করেন, যা একদিকে যেমন ব্যক্তিগত, অন্যদিকে তেমনি বাঙালির চলচ্চিত্র ইতিহাসের এক অনন্য অধ্যায়।
কলকাতার বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের সেই পুরোনো বাড়ির স্মৃতি তুলে ধরে মুনমুন সেন বলেন, বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন আজও মায়ের উপস্থিতিতে ভরা। বৈঠকখানার দেয়ালে ঝুলে থাকা পেইন্টিং, গাঢ় গালিচা, আর এক পাশে ইজেলে রাখা সুচিত্রা সেনের সাদা-কালো ছবি—সব মিলিয়ে যেন এক রূপকথার পরিবেশ। সেই ছবির পায়ের কাছে রাখা সাদা লিলির তোড়া যেন মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার প্রতীক হয়ে আছে।
সাক্ষাৎকারে মুনমুন সেন মৃদু হাসি দিয়ে বলেন, “আজ আমি মায়ের চুড়ি পরেছি।” তার হাত নাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সোনার চুড়ির মৃদু শব্দ যেন অতীতের স্মৃতিকে আরও জীবন্ত করে তোলে। তিনি জানান, মায়ের ব্যবহৃত এই চুড়িগুলো তার কাছে শুধু অলংকার নয়, বরং এক অমূল্য স্মৃতি, যা তাকে প্রতিনিয়ত মায়ের কাছে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
মায়ের সিনেমা ও সাজসজ্জা নিয়েও নানা স্মৃতি তুলে ধরেন তিনি। ‘দেবী চৌধুরানী’ ছবির কথা উল্লেখ করে বলেন, সেই সময় সুচিত্রা সেন নিজের চরিত্রের জন্য নিজেই শাড়ি কিনতেন এবং কীভাবে চরিত্রের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সাজের রূপ বদলাবে, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবতেন। মুনমুন সেন জানান, ওই ছবির ব্লাউজের ডিজাইনও তার নিজের করা—যা তার জীবনের একটি গর্বের বিষয়।
শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন করতে গিয়ে তিনি বলেন, মা তাকে সবসময় সৃজনশীল কাজের প্রতি উৎসাহিত করতেন। পিয়ানো বাজানো, ছবি আঁকা কিংবা আলপনা দেওয়া—সব ক্ষেত্রেই মায়ের উৎসাহ তাকে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। তিনি বলেন, শুটিং শেষে বাড়ি ফিরে সুচিত্রা সেন তার মেয়ের আঁকা আলপনা দেখে খুব খুশি হতেন, যা ছিল তাদের সম্পর্কের এক মধুর দিক।
একটি বিশেষ স্মৃতির কথা উল্লেখ করে মুনমুন সেন বলেন, এক সিনেমায় কনের সাজে মাকে তিনি নিজ হাতে কপালে চন্দন এঁকে দিয়েছিলেন। “মায়ের কোলের ওপর বসে আমি সেই চন্দন পরিয়ে দিই—সেই মুহূর্তে মনে হয়েছিল আমরা মা-মেয়ে নই, বরং দুই সখী,”—বলেন তিনি। এই স্মৃতিচারণে ফুটে ওঠে তাদের গভীর বন্ধন ও আন্তরিক সম্পর্ক।
ব্যক্তিজীবন ও অভিনয়জগত—এই দুইয়ের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য রাখতেন সুচিত্রা সেন, সে প্রশ্নের উত্তরে মুনমুন সেন বলেন, এটি ছিল খুবই জটিল বিষয়। তবে তিনি এটুকু নিশ্চিত করে বলেন, তার মা প্রতিটি দায়িত্বই নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতেন।
সুচিত্রা সেন শুধু একজন অভিনেত্রী নন, তিনি ছিলেন এক যুগের প্রতীক। তার অভিনয়শৈলী, ব্যক্তিত্ব ও জীবনদর্শন আজও নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে। জন্মদিনে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলা যায়—তিনি বেঁচে আছেন তার কাজের মধ্য দিয়ে, স্মৃতির মধ্য দিয়ে, আর ভালোবাসার অমলিন বন্ধনে।


