পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও গভীর সংকট
মোঃ আব্দুল মতিন প্রধান:

পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি বর্তমানে এক নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে, যা সম্প্রতি ২২শে অক্টোবরের সাজেক ভ্যালির অভূতপূর্ব ঘটনার পর থেকে আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সেখানে সাজেক গণঅধিকার রক্ষা কমিটি এবং সাজেক কারবারী অ্যাসোসিয়েশন কর্তৃক একটি অবরোধ এনফোর্স করা হয়েছিল, যাদের মূল দাবি ছিল পিসিজেএসএস-এর সশস্ত্র সদস্যদের অপসারণ করা। এই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ইউপিডিএফ-এর সশস্ত্র সদস্যদেরও সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ার তথ্য জানা যায়। এই সহিংসতা ও অবরোধের মুখে পড়ে প্রায় তিন হাজার পর্যটক সাজেকে আটকা পড়েছিলেন, যাদের পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশ অত্যন্ত দক্ষতার সাথে নিরাপদে উদ্ধার করে।
এই সাম্প্রতিক সংকটের পেছনে লুকিয়ে রয়েছে বিগত কয়েক দশকের ক্রমপরিবর্তিত এক জটিল প্রেক্ষাপট এবং ১৯৯৭ সালের শান্তি চুক্তির মাধ্যমে পাহাড়ের দুর্গম ও অত্যন্ত দুর্গম অঞ্চল থেকে অস্থায়ী সামরিক ক্যাম্পগুলো সরিয়ে নেওয়ার পর তৈরি হওয়া কৌশলগত দুর্বলতা। এই সুযোগেই পাহাড়ে উগ্রপন্থী সংগঠনগুলো নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার সুযোগ পেয়েছে।
প্রাক্তন সেনা কর্মকর্তাদের দীর্ঘ ৯ বছরের সামরিক চাকরির অভিজ্ঞতা—বিশেষত ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সালে খাগড়াছড়ি সেনানিবাস, ২০১২ থেকে ২০১৫ সালে বান্দরবানের রুমা গ্যারিসন এবং ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালে বান্দরবান গ্যারিসনে দায়িত্ব পালনের সুবাদে এটি স্পষ্ট যে, অতীতে পাহাড়ে আধিপত্য বিস্তারের দ্বন্দ্ব মূলত পিসিজেএসএস এবং পরবর্তীতে ইউপিডিএফ—এই দুটি প্রধান আঞ্চলিক গোষ্ঠীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমান চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন; আজ সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো শত শত উগ্রপন্থী সংগঠনের আবির্ভাব ঘটেছে, যারা প্রকাশ্যে অস্ত্র ও লাঠিসোটা নিয়ে মিছিল-মিটিং করছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য এক চরম হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ধারায় নতুন ও বিপজ্জনক মাত্রা যোগ করেছে কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট বা কেএনএফ। ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী নাথান ল্যানচিও বমের নেতৃত্বে গঠিত এই সশস্ত্র সংগঠনটি কয়েকটি উপজেলার সমন্বয়ে পৃথক রাষ্ট্র গঠনের সুদূরপ্রসারী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। তারা শুধু বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি গ্রহণ করেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং নিজস্ব জাতীয় সঙ্গীত, পতাকা ও নকশা তৈরি করে তা কার্যালয়ের সামনে টানানোর মতো দুঃসাহস দেখাচ্ছে।
পিসিজেএসএস, ইউপিডিএফ এবং কেএনএফ-এর মতো উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর সরাসরি আক্রমণের শিকার হচ্ছে আমাদের নিরাপত্তা বাহিনী, বিশেষ করে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। দেশের অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বহু সেনাসদস্য শহীদ হয়েছেন। একের পর এক সহকর্মীর কফিন বাড়িতে পৌঁছানোর এই নির্মম বাস্তবতা সমগ্র দেশের নিরাপত্তার জন্য এক বিরাট সতর্কবার্তা।


