
রাজশাহী প্রতিনিধি: যিনি ক্লাসে নীতি-নৈতিকতা শেখান, যাঁর হাতে গড়ে ওঠার কথা আগামীর ভবিষ্যৎ সেই শিক্ষকই যখন প্রতারণার জালে ফাঁসান সাধারণ মানুষকে, তখন সমাজের বিবেক প্রশ্নের মুখে পড়ে।
রাজশাহীর দুর্গাপুরে এমনই এক চাঞ্চল্যকর প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে এক মাদ্রাসা শিক্ষকসহ তিন আদম দালালের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, সোনালী ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখিয়ে কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়ে যুবক সুমন ইসলামকে একটি কোম্পানির কাছে বিক্রি করে দেয় এই চক্র। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী সুমনের বাবা জান মোহাম্মদ দুর্গাপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামের মাদ্রাসা শিক্ষক আব্দুল মান্নান (৫০), মো. বাবুল (৪৮) এবং একই গ্রামের কম্বোডিয়া প্রবাসী শাকিব (২৮) মিলে একটি সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলে। স্থানীয়ভাবে শিক্ষকতা ও ব্যবসার সুবাদে মান্নান মাস্টার সুমনের পরিবারের আস্থা অর্জন করেন। পরে বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ধাপে ধাপে সুমনের পরিবারের কাছ থেকে ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয় তারা।
গত ৮ অক্টোবর ২০২৫ তারিখে সুমন কম্বোডিয়ায় পৌঁছানোর পরই তার পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া হয়। পরে তাকে একটি কোম্পানির কাছে প্রায় ১ হাজার ডলারে বিক্রি করা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এক বছরের ভিসার প্রতিশ্রুতি দিলেও দেওয়া হয় মাত্র তিন মাসের ট্যুরিস্ট ভিসা। সেখানে তাকে অমানবিক পরিস্থিতিতে কাজ করতে বাধ্য করা হয় এবং ভিসার নামে আরও ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা আদায় করা হয়।
পরবর্তীতে জীবন বাঁচাতে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন সুমন। পরে জরিমানা, ওভারস্টে খরচ ও বিমানের টিকিট বাবদ প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ করে দেশে ফিরতে সক্ষম হন তিনি। সব মিলিয়ে প্রায় ৯ লাখ ৭২ হাজার টাকা হারিয়ে পরিবারটি এখন চরম আর্থিক সংকটে রয়েছে।
সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অভিযুক্ত মান্নান মাস্টার শিক্ষকতার আড়ালে মানুষের আস্থা অর্জন করতেন। তার বিরুদ্ধে মসজিদের অর্থ আত্মসাতের চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। তার সহযোগী বাবুল কাপড় ব্যবসার আড়ালে বিদেশে লোক পাঠানোর নামে বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে প্রলোভন দেখাতেন। অন্যদিকে, কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত শাকিব ভুক্তভোগীদের গ্রহণ করে কোম্পানির কাছে বিক্রি করার মূল ভূমিকা পালন করতেন।
স্থানীয়দের দাবি, এই চক্রের ফাঁদে পড়ে আরও কয়েকটি পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছেন বখতিয়ারপুর, নারায়ণপুর, পাঁচুবাড়ি ও ভবানিপুর এলাকার একাধিক ব্যক্তি। তাদের প্রতারণার ফাঁদে পড়ে অন্ধকারের বিভীষিকা নেমে এসেছে তাদের পরিবারে। প্রতারণার শিকার হয়েছেন, উপজেলার বখতিয়ারপুর গ্রামের নুর ইসলামের ছেলে আমজাদ, নারায়ণপুর গ্রামের আব্দুল্লাহ’র ছেলে নাসির উদ্দিন, একই গ্রামের আতাউর হোসেনের ছেলে বিপ্লব হোসেন, পাঁচুবাড়ি চকপাড়া গ্রামের সিদ্দিকুরের ছেলে সাগর ও ভবানিপুর গ্রামের মৃত খোকা মন্ডলের ছেলে এনামুল ইসলাম।

এনামুল এখনও দেশে ফিরতে না পেরে কম্বোডিয়ায় পালিয়ে বেড়াচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ক্ষুব্ধ স্থানীয় এক যুবক বলেন, “মান্নান মাস্টার ও বাবুলের মতো লোকজন যখন সমাজের ভেতরেই থেকে এমন প্রতারণা করে, তখন আমাদের মতো সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে এ ধরনের ঘটনা বাড়তেই থাকবে।”
ভুক্তভোগী সুমনের বাবা জান মোহাম্মদ বলেন,
“প্রতিবেশী ও শিক্ষক হওয়ায় আমরা তাকে বিশ্বাস করেছি। জমি বন্ধক রেখে সব টাকা দিয়েছি। এখন টাকা চাইলে উল্টো হুমকি দিচ্ছে। আমরা ন্যায্য বিচার চাই।”

অভিযোগের বিষয়ে আব্দুল মান্নান বলেন, তিনি টাকা শাকিবের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন এবং নিজেকে আদম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন।
মানবাধিকার কর্মী ও আইনজীবী আকমল হোসেন বলেন,”গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের টার্গেট করে একটি চক্র প্রতারণা করছে। দ্রুত প্রশাসনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন এবং সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।”
এব্যাপারে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) পঞ্চনন্দ সরকার বলেন, আমি থানায় সদ্য যোগদান করেছি। অভিযোগের বিষয়ে আমার জানা নাই। বিষয়টি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাশতুরা আমিনার সঙ্গে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
